আধ্যাত্মিক বিজ্ঞানে গুরুর প্রকারভেদ
গুরু Preceptor (প্রিসিপ্টর)/ ‘معلم’ (মুয়াল্লিম)
এটি রূপক-সাহিত্যের বৈক্তিক-বৈশিষ্ট্য সারণির ‘জ্ঞান’ পরিবারের অন্যতম একটি ‘রূপক পরিভাষা’। এর প্রকৃত-মূলক ‘জ্ঞান’, সহযোগী-মূলক ‘জ্ঞানেন্দ্রিয়’, উপমান পরিভাষা ‘আলো’, চারিত্রিক পরিভাষা ‘সম্বিত’ ও ছদ্মনাম পরিভাষা ‘মানুষগুরু’।
![]() |
| গুরুর প্রকারভেদ | গুরুতত্ত্ব |
গুরু (রূপ)বি উপদেষ্টা, উপদেশক, শিক্ষক, দীক্ষক, দেশিক, দিশারী, শাস্ত্রীয় জীবনের উপদেষ্টা, সাধনপন্থা নির্দেশক, সম্মানে বা বয়সে জ্যেষ্ঠ, মাননীয় ব্যক্তি, Preceptor, ‘معلم’ (মুয়াল্লিম) বিণ ভারী, গুণসম্পন্ন, দুর্বহ, দায়িত্বপূর্ণ, কঠিন, মহান, দুরূহ, শ্রদ্ধেয়, মাননীয়, অতিশয়, অধিক (ব্যা) দীর্ঘ মাত্রাযুক্ত (আবি) জ্ঞান, বুদ্ধি, প্রজ্ঞা, knowledge, আক্বল (আ.ﻋﻘﻝ), ইলিম (আ.ﻋﻟﻢ), বিচারক, মুর্শিদ (আ.ﻤﺭﺷﺪ), পির (ফা.ﭙﻴﺭ), master, teacher।
গুরুর সংজ্ঞা (Definition of Preceptor)
যে মহান মনীষী মানুষকে নৈতিক শিক্ষাদীক্ষা প্রদান করেন তাঁকে গুরু বলে।
গুরুর আধ্যাত্মিক সংজ্ঞা (Theosophical Definition of Preceptor)
চিত্তপটে সঞ্চিত ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য তথ্যাদিকে জ্ঞান বা গুরু বলে।
গুরুর প্রকারভেদ (Classification of Preceptor)
গুরু চার প্রকার। যথা—
মানুষগুরু
জগৎগুরু
কামগুরু
পরমগুরু
১. মানুষগুরু (Inductor)
মানুষগুরুর সংজ্ঞা
মানুষ আকারধারী যে মহান মনীষী সাধারণ মানুষকে জ্ঞান শিক্ষা প্রদান করেন তাকে মানুষগুরু বলে। যেমন বিদ্যালয়ের শিক্ষক।
মানুষগুরুর আধ্যাত্মিক সংজ্ঞা
রূপক-সাহিত্যে গুরুপদ প্রাপ্ত ব্যক্তির জ্ঞানকে গুরু বলে। যেমন সম্বিত।
মানুষগুরুর প্রকারভেদ
১. আধ্যাত্মিক গুরু (Spiritual Preceptor)
আত্মদর্শন বা পরাবিদ্যার শিক্ষাদীক্ষা প্রদানকারীকে আধ্যাত্মিক গুরু বলে।
২. জাগতিক গুরু (Mundane Preceptor)
বৈষয়িকবিদ্যা শিক্ষাদানকারী পণ্ডিতকে জাগতিক গুরু বলে।
মানুষগুরুর পরিচয়
যে মহান মনীষী মানুষকে নৈতিক শিক্ষাদীক্ষা প্রদান করেন তাকে মানুষগুরু বলা হয়। প্রকৃতপক্ষে মানুষগুরু হলো মানুষের ‘জ্ঞান’। জ্ঞান নিত্য, অক্ষয়, অমর ও অনন্ত; কিন্তু মানুষ অনিত্য ও ধ্বংসশীল। এ কারণে মানুষগুরুরূপ ব্যক্তির মধ্যে যে জ্ঞান রয়েছে, সেই জ্ঞানই প্রকৃত গুরু।
২. জগৎগুরু (Inhaler)
জগৎগুরুর সংজ্ঞা
সারাবিশ্বে বিরাজিত বাতাসকে জগৎগুরু বলে।
জগৎগুরুর আধ্যাত্মিক সংজ্ঞা
রূপক-সাহিত্যে নাসিকার শ্বাসকে জগৎগুরু বলে।
জগৎগুরুর পরিচয়
রূপক-সাহিত্যে বাতাস বলতে নাসিকা যোগে চলাচলকারী শ্বাসকে বোঝানো হয়। এই শ্বাস সর্বদা জীবের সঙ্গে অবস্থান করে এবং জীবনধারণের মূল শক্তি হিসেবে কাজ করে। বিশ্বব্যাপী বিরাজমান হওয়ার কারণে একে জগৎগুরু বলা হয়।
৩. কামগুরু (Cupid)
কামগুরুর সংজ্ঞা
শাস্ত্রীয়দের মতে কামের প্রতীতি মদনকে কামগুরু বলে।
কামগুরুর আধ্যাত্মিক সংজ্ঞা
রূপক-সাহিত্যে পুরুষ জীবের শিশ্নকে কামগুরু বলা হয়।
কামগুরুর পরিচয়
জীবের বংশবিস্তার, সামাজিক ও সাংসারিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় কামের গুরুত্ব অপরিসীম। সেই কারণেই রূপক-সাহিত্যে কাম বা মদনের প্রতীকী রূপকে কামগুরু বলা হয়েছে।
৪. পরমগুরু (Beverage)
পরমগুরুর সংজ্ঞা
জীবের লালনপালনকর্তা সাঁইকে পরমগুরু বলে।
পরমগুরুর আধ্যাত্মিক সংজ্ঞা
জীবজগতের পালনকর্তা সাঁইকে পরমগুরু বলে।
পরমগুরুর পরিচয়
রূপক-সাহিত্যে সাঁইকে পরমগুরু বলা হয়। মাতৃজঠরে ভ্রূণ লালনকারী অমৃতরস বা জীবনধারণের মূল পুষ্টিধারাকে রূপক অর্থে পরমগুরু বলা হয়েছে।
গুরুর গুরুর পরিচয়
গুরুর গুরু হলো জ্ঞান। জ্ঞানের ঊর্ধ্বে আর কোনো গুরু নেই। জ্ঞানই সকল গুরুর শ্রেষ্ঠ গুরু।
‘জয়গুরু’ বলার তাৎপর্য
গুরু চার প্রকার— মানুষগুরু, জগৎগুরু, কামগুরু ও পরমগুরু। পরম্পরা মতবাদ অনুসারে মানুষগুরু ও জগৎগুরুকে ‘জয়গুরু’ বলে সম্বোধন করার প্রথা প্রচলিত রয়েছে।
গুরুতত্ত্ব
গুরুতত্ত্ব অত্যন্ত গভীর ও সূক্ষ্ম একটি বিষয়। প্রকৃত সাধকগুরু ব্যতীত গুরুতত্ত্বের প্রকৃত রহস্য উপলব্ধি করা কঠিন। গুরুতত্ত্বের মূল ভিত্তি হলো জ্ঞান, আত্মদর্শন, শ্বাসতত্ত্ব, প্রেম ও সাধনা।
উপসংহার
রূপক-সাহিত্যের আলোকে গুরু কেবল একজন ব্যক্তি নন; বরং জ্ঞান, শ্বাস, কাম ও সাঁই-সম্পর্কিত গভীর আধ্যাত্মিক প্রতীকের সমষ্টি। এই দর্শন অনুযায়ী গুরু চার প্রকার— মানুষগুরু, জগৎগুরু, কামগুরু ও পরমগুরু। তবে সকল গুরুর ঊর্ধ্বে অবস্থান করে জ্ঞান, যা সর্বশ্রেষ্ঠ গুরু হিসেবে বিবেচিত।
তথ্যসূত্র:
আত্মতত্ত্ব ভেদ (৪র্থ খণ্ড)
লেখক: বলন কাঁইজি
